দক্ষিণ আফ্রিকায় গত সাড়ে চার বছরে অন্তত ৪৫২ জন বাংলাদেশি নিহত

প্রবাস সাবলিড

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : দক্ষিণ আফ্রিকায় গত সাড়ে চার বছরে অন্তত ৪৫২ জন বাংলাদেশি নিহত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এ বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষের কাছে উদ্বেগ তুলে ধরে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ডিসেম্বরের শুরুতে এ নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন কর্মকর্তা। বিবিসি বাংলা

প্রিটোরিয়াতে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে জানানো হয়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় মোট ৪৫২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর মধ্যে ২০১৯ সালের প্রথম ৯ মাসে ইতোমধ্যে ৮৮ জন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাব্বির আহমেদ চৌধুরী বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, নিহতদের শতকরা ৯৫ শতাংশই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। যার মধ্যে বেশিরভাগই ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত ও নারীঘটিত শত্রুতার কারণে নিহত হয়েছেন বলে হাইকমিশন জানতে পেরেছে।

তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মো. রেজাউল করিম খান ফারুক জানিয়েছেন, বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন দোকানপাটে হামলা এবং লুটতরাজ প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।এছাড়া, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেপটাউন, জোহানেসবার্গ, প্রিটোরিয়া এবং ব্লুমফন্টেইনে অভিবাসী বিরোধী হামলার শিকার হয়েছেন বহু বাংলাদেশি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে বৈধ ও অবৈধভাবে যারা আসেন, নানাভাবে কিছুদিন পর তারা এখানে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করে, বিশেষ করে মুদি বা গ্রোসারি দোকান দেয় তারা। তখন দেখা যায় বাংলাদেশি আরেকজন অভিবাসীর সঙ্গেই হয়তো তার দ্বন্দ্ব শুরু হলো। এর পরিণতিতে অনেক খুনখারাবি আমরা দেখেছি। এছাড়া কাগজপত্র বিশেষ চেক করা হয় না বলে অনেকে চলে যায় গ্রামের দিকে। সেখানে গিয়ে দেখা যায় তারা স্থানীয়দের সঙ্গে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এ থেকে দোকানে লুট ও সংঘর্ষ এবং খুনের ঘটনা ঘটার অভিযোগ আছে।

তিনি আরো বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশিদের জন্য একটি বড় সমস্যা হচ্ছে দেশটিতে বহু বাংলাদেশি অবৈধভাবে অবস্থান ও কাজ করছেন, যে কারণে অনেক সময় হত্যাকাণ্ডের পর মামলা করায় জটিলতা সৃষ্টি হয়।

ফারুক জানান, হামলা, লুট ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করে অভিবাসী বাংলাদেশিরা নিরাপত্তা চেয়ে জাতিসংঘ শরণার্থী হাইকমিশনের কার্যালয়ের সামনে নভেম্বর মাসে বিক্ষোভও করেছে।দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মরত বাংলাদেশি কমিউনিটির হিসাব অনুযায়ী দেশটির বিভিন্ন শহরে এই মুহূর্তে প্রায় ৩ লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগ কেপটাউন, জোহানেসবার্গ ও ব্লুমফন্টেইনে থাকেন। মূল শহরের আশেপাশে ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে কাজ করেন অনেকে।কী করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আফ্রিকা উইংয়ের মহাপরিচালক মালেকা পারভিন জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা ইতোমধ্যেই দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষের কাছে উদ্বেগ তুলে ধরে কয়েক দফা নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ডিসেম্বরের শুরুতে এ নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে যে ওই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর তো আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থামাতে আমরা নিজেরা সরাসরি কিছু করতে পারছি না।

তিনি আরো জানান, তাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হবার কারণে কেবল বাংলাদেশি নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার আশপাশের দেশগুলো থেকে যারা ওখানে এসে ব্যবসা বাণিজ্য করছে সবাই হামলার শিকার হচ্ছে। সরকারের এই কর্মকর্তার মতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, দেশটিতে অনেক অবৈধ বাংলাদেশি কাজ করছেন, যে কারণে হামলা বা হুমকির শিকার হলে অনেকেই দূতাবাস বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ জানাতে যায় না। ফলে ঠিক কী পরিমাণ মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছেন সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া কঠিন।

তবে অভিবাসী বিরোধী হামলার প্রেক্ষাপটে সেপ্টেম্বরের শুরুতে দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের চলাচলে সতর্কতা জারি করে বাংলাদেশ হাইকমিশন। দক্ষিণ আফ্রিকার বেকারত্ব ও অপরাধ প্রবণতা নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশ থেকে মানুষ দক্ষিণ আফ্রিকায় কাজের সন্ধানে যেতে শুরু করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বৈধভাবে এক লাখের মতো বাংলাদেশি রয়েছেন।দেশটিতে এখনো সাদা ও কালো মানুষদের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপক। ভূমির মালিকানা নিয়েও রয়েছে চরম অসন্তোষ। সেই সঙ্গে গত কয়েক বছর ধরে দেশটিতে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। স্থানীয়দের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ শতাংশ। কর্মসংস্থান না থাকায় কেপটাউন ও জোহানেসবার্গসহ বড় শহরগুলোর অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া দেশটির একটি বড় সমস্যা। অনুলিখন : হ্যাপি আক্তার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *